আমি ফুলঝুরি আর ও জুলিয়া। আমার পাড়ার মেয়ে। ওরা ঐ বারোতলা ফ্ল্যাটের আটতলায় থাকে। ওদের একটা ধবধবে সাদা রঙের মস্ত গাড়ি আছে। ওর মা রনিতা কাকিমা, সবসময় কী সুন্দর করে সেজে থাকেন; ওর বাবা মলয়কাকু কী হাসিখুশি! ওঁরা মাঝে মাঝে বিকেলে সবাই মিলে বেড়াতে যান। তখন আমি আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় ক্রিকেট খেলি। তবে ও আর আমি একই স্কুলে পড়ি। আমি জানি, মলয়কাকু স্কুলের সব টাকা দেন। আমার বাবা যে মলয়কাকুর স্টাফ। স্টাফ মানে আগে জানতাম না, এখন জানি, জুলিয়া বলেছে। রনিতা কাকিমা আমায় রোজ টিফিনও দেন। ওরা খুব ভালোবাসেন আমাকে। জুলিয়াও ভালো।
মা বলেছেন, মনের মধ্যে দুষ্টুমি এলে, ভগবানকে বলতে। তাই বলছি, হে ভগবান, তুমি জানো, জুলিয়াকে আমার খুব হারাতে ইচ্ছে করে। ভীষণ ইচ্ছে করে, কেউ আমার হাতটা উঁচু করে তুলে বলুক, "ফার্স্ট হয়েছে, ফুলঝুরি পাল!" কিন্তু হয় না। আমার জামা খুব সাদা নয়। আমার রেজাল্ট খুব ভালো হয় না। মাঝে মাঝে বাংলা বলে বকুনি খাই। লজ্জা করে কিন্তু তবু আমি চেষ্টা করি। ভালো হওয়ার চেষ্টা করি। ঠিক করি না ভগবান?
কাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। কাল একটা খেলা আছে। কেউ বাংলা ছাড়া একটাও অন্য ভাষার শব্দ ইউজ়...মানে ইয়ে...ব্যবহার করতে পারবে না। আমি এটা পারব। পারবই, হি হি হি! আমি যে লুকিয়ে লুকিয়ে বাংলা গল্পের বই পড়ি ! আমাদের পড়ার সামু বাংলা স্কুলে পড়ে। কী সুন্দর সুন্দর বাংলা কবিতা আবৃত্তি করে! ও বাংলা বই দেয়, কবিতা শেখায়। আমি ওকে ইংরেজি শেখাই অবশ্য, যা পারি শেখাই। তাই আমি বাংলা খুব ভালোবাসি, জানিও অনেক শব্দ !
স্কুলের ফার্স্ট পিরিয়ডের পর খেলা। ভাষা দিবস কেন হয় বললেন ম্যাডাম। ফুলঝুরির চোখে জল এসে গেল শুনতে শুনতে। এবার নাম ডাকা হচ্ছে,
"তানিয়া...সায়ক... জুলিয়া...দোয়েল... ফুলঝুরি...শুভায়ু...!" বারোজন ছেলেমেয়ে। দশমিনিট কথা চালাতে হবে। শুরু হল। একটা অন্য ভাষার শব্দ বললেই আউট। জুলিয়া সাত মিনিটের মাথায় "টাইম" বলে ফেলে আউট হল।
ফুলঝুরির কথা শুরু হলো। ছয় মিনিট... এখনও একটাও ভুল হয়নি... নয় মিনিট, এখনও না! দশ মিনিট...!
ইয়াআআআ! লাফিয়ে উঠল ফুলঝুরি। ম্যাডাম এসে ওর হাত তুলে বললেন, "প্রথম হয়েছে ফুলঝুরি পাল"। ওর হাতে তুলে দেওয়া হল "আম আঁটির ভেঁপু"!
ফুলঝুরি সেদিন মায়ের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে লাফালাফি করল অনেকক্ষণ। ওর বাবা বড়ো এক হাঁড়ি রসগোল্লা এনেছেন। বললেন, "বাঙালি মিষ্টি। সবাই মিলে খাও!" জুলিয়াও এসেছিল। চুপি চুপি বলল, "আমাকে তোর বইটা পড়তে দিবি ?"
ফুলঝুরি ঘাড় কাত করে তখনই দিয়ে দিল। ওর তো কবেই পড়া এ বই!
(সমাপ্ত)
-রাণু শীল